আবারও ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায়,ঢাকার বাসে

আবারও ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায়,ঢাকার বাসে

ঢাকায় গণপরিবহনে সরকারের ভাড়া নির্ধারণের প্রায় দুই মাস হলো। আবার ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত ভাড়া রাখা হচ্ছে গণপরিবহনে। সম্প্রতি ঢাকার কয়েকটি রুটে ঘুরে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

কেউ রাখছে নিজেদের ইচ্ছেমতো, আবার কেউ রাখছে ওয়েবিলের কথা বলে। আর বাসে ভাড়ার তালিকা রাখা বাধ্যতামূলক হলেও বেশির ভাগই রাখছেন না। যাত্রীরা ন্যায্য ভাড়া দিতে চাইলে বাসের সহকারী, এমনকি চালকেরা তর্কে জড়াচ্ছেন, শোনাচ্ছেন কটু কথা।

গত নভেম্বরের শুরুর দিকে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির পর সব ধরনের জ্বালানিচালিত বাসে বাড়তি ভাড়া নেওয়া শুরু হয়। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও এ ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়তে শুরু করে। একপর্যায়ে অর্ধেক বাস ভাড়ার দাবিতে শিক্ষার্থীরা সড়কে নেমে আসে।

সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন চালাতে থাকে তারা। এসবের চাপে নভেম্বরের মাঝামাঝি বাসমালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন ভাড়া নির্ধারণ করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।

শুরুর দিকে বেশির ভাগ গণপরিবহনই নির্ধারিত ভাড়া নিত। কিন্তু এরই মধ্যে পরিস্থিতি পুরো পাল্টে গেছে। প্রায় সব গণপরিবহনই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে বলে জানিয়েছেন ঢাকার কয়েকটি রুটের অন্তত ১৫ জন যাত্রী। ব্যতিক্রম শুধু গত মাসে চালু হওয়া রুটভিত্তিক কোম্পানির অধীনে চলা ঢাকা নগর পরিবহন।

গণপরিবহনের নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনার জন্য ফেসবুকে একটি গ্রুপ আছে। এটির নাম ট্রাফিক অ্যালার্ট বিডি। এর সদস্যসংখ্যা দুই লাখের বেশি। সেখানে ৩০ ডিসেম্বর এই প্রতিবেদকের একটি পোস্টে ৩০ জনের বেশি যাত্রী তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা জানান।

এ ছাড়া প্রতিবেদক অন্তত ছয়টি ভিন্ন রুটের পরিবহনে ঘুরে দেখেন। এসবের বাইরে অন্যান্য কিছু রুটের নিয়মিত যাত্রীদের অনেকের সঙ্গে কথা হয়। অভিজ্ঞতা ঘুরেফিরে একই। সরকার নির্ধারিত ভাড়া আমলে নিচ্ছেন না গণপরিবহনের মালিক-কর্মচারীরা।

ওয়েবিল কী বাসে কতজন যাত্রী থাকেন, সেই হিসাব মালিকের পরিদর্শক যে কাগজে লিখে দেন, সেটাই ওয়েবিল। একটি রুটে সাধারণত নির্দিষ্ট কয়েকটি জায়গায় মালিকের লোকেরা এই পরিদর্শন বা চেক করেন। পথে যাত্রীরা যেখানেই নামেন না কেন, নির্দিষ্ট দূরত্বের ভাড়া দিতে হয়। ধরা যাক, একজন যাত্রী মিরপুর ১০ নম্বর সেকশন থেকে আগারগাঁও যাবেন। ওয়েবিল ব্যবস্থায় ভাড়া দিতে হবে ফার্মগেট পর্যন্ত।

দাঁড়িয়ে গেলেও গুনতে হয় বেশি ভাড়া দাঁড়িয়ে গেলেও গুনতে হয় বেশি ভাড়াফাইল ছবি সরেজমিন যা দেখা গেল
শফিকুল ইসলাম ও মনসুর আলম একই বাসের পাশাপাশি আসনে বসে আছেন। গন্তব্যও এক—মহাখালী। প্রথমজন বাসে উঠেছেন আসাদগেট থেকে, অন্যজন খামারবাড়ি থেকে। এ দুইয়ের মধ্যে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ওয়েবিল (বাসমালিকের বেঁধে দেওয়া ভাড়া) পরীক্ষা করা হয়।

বিকাশ পরিবহনের সেই বাসে সরকার নির্ধারিত প্রতি কিলোমিটার ২ টাকা ১৫ পয়সা মেনেই ভাড়ার তালিকা ঝোলানো আছে। তবে বাসের সামনের কাচের দরজার আড়ালে। চলন্ত বাসে কাছাকাছি গিয়ে তালিকাটি পড়া অসম্ভব নয়, তবে কঠিন।

ওয়েবিলের হিসাবে ভাড়া চায় তারা। কিন্তু আমি মানচিত্রে দূরত্ব দেখে ভাড়া দিই নিয়মিত। তবে বাসের বেশির ভাগ মানুষই সচেতন নয়। যা চায়, তাই দেয়।
রাহভী ইসলাম, শিক্ষার্থী

এরই মধ্যে শফিকুল ইসলাম ও মনসুর আলমের কাছে ২০ টাকা করে ভাড়া চাইলেন চালকের সহকারী। নির্ধারিত ভাড়া সম্পর্কে তাঁদের ধারণা না থাকলেও এতটুকু পথের ভাড়া এত বেশি কেন জানতে চাইলে দুই পক্ষে তর্ক শুরু হয়। চালকের সহকারী মোহাম্মদ রফিক বললেন, ‘সামনে গিয়ে তালিকা দেখে আসেন।’

ভাড়ার তালিকা অনুসারে, খামারবাড়ি থেকে বনানীর ভাড়া ১০ টাকা। সম্প্রতি সরকার নির্ধারিত সর্বনিম্ন ভাড়া এটি। তাহলে ২০ টাকা কেন চাইলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ রফিক বলেন, ‘ভাড়া কত লেখা, তা জানি না। পড়তে পারি না।’

আসলে ভাড়ার তালিকা নয়, বরং ওয়েবিলের নির্ধারিত ভাড়া চেয়েছিলেন রফিক। তর্কাতর্কির পর শফিকুল ইসলাম ও মনসুর আলম দুজনই ১৫ টাকা করে ভাড়া দিলেন। শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি তো ওয়েবিলের পরে উঠেছি। তারপরও সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা রাখেনি।’

আজিমপুর থেকে আবদুল্লাহপুরের ধউর বেড়িবাঁধ পর্যন্ত যায় বিকাশ পরিবহনের বাসগুলো। সরকার নির্ধারিত তালিকা অনুসারে, পুরো পথের দূরত্ব প্রায় সাড়ে ২৭ কিলোমিটার, এ পথের ভাড়া ৫৯ টাকা। এ ছাড়া চার্ট অনুযায়ী মধ্যে ছয়টি স্টপেজ হিসেবে ভাড়া নির্ধারিত।

তবে এ পথে ভাড়া নেওয়া হয় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, বনানী ও আবদুল্লাহপুর—এই তিন ওয়েবিলের হিসাবে। প্রথম দুটি ওয়েবিলে প্রতিটি পার হওয়ার জন্য যাত্রীকে ২০ টাকা করে এবং শেষেরটির জন্য ১৫ টাকা দিতে হয়। আজিমপুর থেকে ধউর—এ পথে সরকার নির্ধারিত তালিকার চেয়ে এ দূরত্বে ওয়েবিলের ভাড়া কম। কিন্তু স্বল্প দূরত্বে চলতে গেলেই গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া।

ট্রাফিক শৃঙ্খলা পক্ষেও যত্রতত্র বাস থামানো বন্ধ হচ্ছে না। সিটিং সার্ভিসের নামে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হলেও বাসে আসনের অতিরিক্ত যাত্রী তোলা হচ্ছে। রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায়
ট্রাফিক শৃঙ্খলা পক্ষেও যত্রতত্র বাস থামানো বন্ধ হচ্ছে না। সিটিং সার্ভিসের নামে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হলেও বাসে আসনের অতিরিক্ত যাত্রী তোলা হচ্ছে।

রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় প্রথম আলো ফাইল ছবি
দেওয়ান পরিবহনের বাস আজিমপুরের পলাশী থেকে কুড়িল বিশ্বরোড পর্যন্ত চলে। রাহভী ইসলাম বাড্ডা লিংক রোড থেকে এলিফ্যান্ট রোডের বাটা সিগন্যালে যাবেন। ওয়েবিলের হিসাবে এ দূরত্বের ভাড়া ২৬ টাকা।

কিন্তু চালকের সহকারী ভাড়া চাইলেন ৪০ টাকা, অর্থাৎ নির্ধারিত ভাড়ার দেড় গুণ। এই বাসে ভাড়ার তালিকাও ছিল না।

তবে গুগল মানচিত্রে দূরত্ব মেপে ২০ টাকা ভাড়া ধরে এর অর্ধেক ১০ টাকা দেন শিক্ষার্থী রাহভী ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ওয়েবিলের হিসাবে ভাড়া চায় তারা। কিন্তু আমি মানচিত্রে দূরত্ব দেখে ভাড়া দিই নিয়মিত। তবে বাসের বেশির ভাগ মানুষই সচেতন নয়। যা চায়, তাই দেয়।’

 

বাসে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে দেখা যায় অনেকেরই নির্ধারিত ভাড়া সম্পর্কে ধারণা নেই। বাসে সেই তালিকা দেখতেও চান না।

একই বাসে মহাখালী থেকে এলিফ্যান্ট রোডের সায়েন্স ল্যাব মোড়ে যাচ্ছিলেন উৎপল সাহা। নির্ধারিত তালিকা অনুসারে, এ পথের ভাড়া ১৮ টাকা। কিন্তু তিনি ভাড়া দিয়েছেন ২৫ টাকা। উৎপল সাহা বলেন, ‘তালিকা দেখতে চাইলে খারাপ ব্যবহার করে। মানসম্মানের ভয়ে কিছু বলি না।’

আল-মক্কা পরিবহন চলে দিয়াবাড়ী থেকে নারায়ণগঞ্জ। সে বাসেই যাচ্ছিলেন আবু হানিফ। তালিকা অনুসারে, মহাখালী থেকে পল্টনের ভাড়া ১৫ টাকা। কিন্তু তাঁর কাছ থেকে রাখা হয়েছে ২০ টাকা। ওয়েবিলের কথা বলে এ ভাড়া রাখা হয়েছে।

প্রায় সব বাসেই ভাড়া নিয়ে অনিয়ম চলে
প্রায় সব বাসেই ভাড়া নিয়ে অনিয়ম চলেফাইল ছবি
যাত্রীদের অভিজ্ঞতা
মালঞ্চ পরিবহন চলে ধূপখোলা থেকে মোহাম্মদপুর পর্যন্ত। এ রুটে গেন্ডারিয়া থেকে জিগাতলার কর্মস্থলে নিয়মিত যাতায়াত করেন আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেন, এ পথে দূরত্ব হিসেবে ভাড়া ২৬ টাকা। কিন্তু নিয়মিত নেয় ৪০ টাকা।

অর্থাৎ আশরাফুল ইসলামের মাসে যাতায়াতে খরচ হয় ১ হাজার ৮০০ টাকার মতো, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও সাড়ে ৬০০ টাকা বেশি।

ট্রাস্ট বাসে করে মিরপুর ডিওএইচএস থেকে ফার্মগেট নিয়মিত যাতায়াত করেন ফাহিম শাহরিয়ার। তালিকা অনুসারে এ দূরত্বে ভাড়া ২৬ টাকা। ফাহিম শাহরিয়ার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁকে নিয়মিতই ৪০ টাকা ভাড়া দিতে হয়।

মেহেদি হাসান বাসাবো থেকে মিডলাইন পরিবহনে মতিঝিল যাতায়াত করেন। গুগল মানচিত্রে এ পথের দূরত্ব তিন কিলোমিটার। তিনি বলেন, ‘ওয়েবিলের কথা বলে এ পথে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভাড়া রাখে ১০ টাকা। বাকি যাত্রীদের থেকে ১৫ টাকা। আমি নিজে ১০ টাকা দিই তর্ক করে। আগে বহু বলতাম এসব ব্যাপারে। এখন সহযাত্রীদের ওপর বিরক্ত। নিজেরটা নিজের বুঝি, আর বাকিদের তামাশা দেখি।’

এ ছাড়া রজনীগন্ধা ও লাব্বাইক পরিবহনের বাসেও ভাড়ার তালিকা মানার বালাই নেই। সায়েদাবাদের জনপথ থেকে রায়েরবাগ পর্যন্ত ভাড়া নিচ্ছে ২০ টাকা করে। অথচ তালিকায় ভাড়া লেখা ১৩ টাকা।

 

বাসমালিকের লাভ কম-বেশি
ওয়েবিলের হিসাবে নির্ধারণ না করলে বাসচালক ও চালকের সহকারীদের অনেকে সঠিক ভাড়ার হিসাব দেন না বলে জানান বিকাশ পরিবহনের চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ। তিনি বলেন, এমনটা হলে বাসমালিকের লাভ কম হয়।

 

এ ছাড়া অনেক বাসের তুলনায় আসন ভালো হওয়া, ফ্যানের (পাখা) সুবিধা রাখায় ভাড়া কিছুটা বেশি নেওয়া হয় বলে জানান হারুনুর রশিদ। তিনি বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় চালাতে হবে জানলে আগে লোকাল বাসের মতো চালাতাম। বাসের পেছনে এত খরচ করতাম না। সরকারের সিদ্ধান্ত যায় না আমাদের সঙ্গে।’

দেওয়ান পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আজাহারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ওয়েবিলের মাধ্যমে এ রুটে আগে যে দূরত্বে ২৫ টাকা রাখা হতো, এখন রাখা হচ্ছে ২০ টাকা। এ কারণে দৈনিক দুই হাজার টাকার বদলে এখন লাভ হচ্ছে এক হাজারের মতো। সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় গেলে লাভ আরও কমবে।

আজাহারুল ইসলাম বলেন, দেওয়ান পরিবহনের রুটে ফার্মগেটের কোচিং সেন্টারসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক সংখ্যক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে অর্ধেক ভাড়া রাখতে হচ্ছে। এ ছাড়া পরিবহনের পক্ষ থেকে মাসে দুই লাখ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। যদিও কাদের দিতে হয়, সে নাম তিনি বলতে রাজি হননি।

 

অভিযোগ পেলেই ডাকা হচ্ছে
তবে অভিযোগ পেলেই মালিকদের সমিতি অফিসে ডাকা হচ্ছে ও আলোচনা করা হচ্ছে বলে দাবি খন্দকার এনায়েত উল্যাহর। তিনি বলেন, তারপরও অনেকে নিয়ম মানতে চান না।

ওয়েবিলে না চললে চুরির আশঙ্কা থাকে, এমন কথার জবাবে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘কথাটা সত্য। শ্রমিকেরাই আসলে বাসের ভাড়া কাটে। শ্রমিকেরা বেশি লাভের জন্য মালিকদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে এখনো কাজ করছে।’নিয়ন্ত্রণে না এলে জরিমানা

বিআরটিএর চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ম্যাজিস্ট্রেটরা গাড়ির ফিটনেস, ড্রাইভারের লাইসেন্সসহ পরিবহন আইনে রয়েছে এমন সব বিষয় লঙ্ঘন হলো কি না, তা দেখেন। তিনি বলেন, ‘এগুলোর অগ্রাধিকার সর্বোচ্চ। (সরকার কর্তৃক) ভাড়া ঠিক হওয়ার পর ভাড়ার বিষয়টিও দেখছে।’

তারপরও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না, এমন প্রশ্নের জবাবে বিআরটিএ চেয়ারম্যান বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণে না আসলে জরিমানা দিবে। কেউ যদি আইন না মানে, সেটার উত্তর তো আমার কাছে নেই। যারা খারাপ কাজ করে, তারা জেল থেকে বের হয়েও খারাপ কাজ করে।’

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.