জীবনে ‘এত সুন্দর ভোট দেহি নাই’

জীবনে ‘এত সুন্দর ভোট দেহি নাই’

পাবনার বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে সমবায় কিন্ডারগার্টেন ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে এসেছিলেন ৮০ বছরের হোসেন আলী। ভোট দিয়ে বাড়ি যাওয়ার সময় তিনি বলেন, ‘এবারের ভোট নিয়্যা খুব ভয়ে আছিল্যাম। কিন্তু কুনু ঝামেলা আর অশান্তি ছাড়াই ভোট হতেছে। আসলে এত সুন্দর ভোট জীবনে দেহি নাই।’

এই ভোটকেন্দ্রেই ২০১১ সালের ইউপি নির্বাচনে সংঘর্ষ হলে একজন নিহত ও শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। গত ইউপি নির্বাচনসহ অন্যান্য বছরের ইউপি নির্বাচনেও এই ভোটকেন্দ্রে ভোট নিয়ে ছিল উত্তেজনা ও নানা অভিযোগ। তাই হোসেন আলী এবার শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে পেরে বেজায় খুশি। তবে শুধু এই ভোটকেন্দ্রেই নয়, উপজেলার প্রায় সব ভোটকেন্দ্রেই এমন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে স্বস্তি লক্ষ্য করা গেছে।

পঞ্চম ধাপে আজ বুধবার সকাল ৮টায় উপজেলার ৯টি ইউপির মোট ৯০টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। এর মধ্যে দুটিতে আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হবে কি না, তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই ছিল শঙ্কা। কিন্তু কোনো অঘটন ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে এ নির্বাচন।

এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আজ সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ছিল ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীত। ফলে ভোটকেন্দ্রগুলোতে সকালে ভোটারের উপস্থিতি কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে। প্রতিটি কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ভোট সুষ্ঠু হওয়ার খবর পেয়ে ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে নারী-পুরুষ ভোটার লাইনে এসে দাঁড়ান। প্রভাবমুক্ত পরিবেশে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পেরে তাঁরা খুশি।

 

কয়েকজন সাধারণ ভোটার বলেন, গত কয়েক বছরে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন নির্বাচন দেখে অনেকেই ভোটের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। এবারের ইউপি নির্বাচনের ভোট গ্রহণের কয়েক দিন আগে বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় দেখা দেয় ব্যাপক উত্তেজনা। গত কয়েক দিনে কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটা ছাড়াও নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের নির্বাচনী ক্যাম্পে হামলা ও অগ্নি–সংযোগের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ ওঠে নৌকা প্রতীকের প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকদের নামে মামলা দিয়ে মাঠছাড়া করতেই এসব হামলা ও অগ্নি–সংযোগের ঘটনা সাজানো হয়েছিল। এসব ঘটনায় থানায় অভিযোগ দায়েরের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু ঘটনায় মামলাও রেকর্ড হয়েছে। ফলে সাধারণ ভোটার থেকে শুরু করে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সুষ্ঠু ভোট গ্রহণ হওয়া নিয়ে তীব্র শঙ্কা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে কোনো অঘটন ছাড়াই ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে।

দুপুর একটায় উপজেলার জাতসাখিনী ইউনিয়নের সিংহাসন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ভোটারের দীর্ঘ সারি। প্রতে৵ক ভোটারের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়। ভোটকেন্দ্রের একটি বুথে কথা হয় নৌকা প্রতীকের এজেন্ট উজ্জ্বল হোসেন ও নৌকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আনারস প্রতীকের এজেন্ট হাসান আলীর সঙ্গে। তাঁরা দুজনেই প্রথম আলোকে জানান, গত ২০ বছরের মধ্যে এত সুষ্ঠু ভোট তাঁরা দেখেননি। এ ছাড়া ভোটারদের মধ্যে ভোট দেওয়ার এত আগ্রহও এর আগে দেখা যায়নি।

দুপুর দেড়টার দিকে চাকলা ইউনিয়নের কনটেস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভোটকেন্দ্রে গিয়েও ভোটারের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা হাকিমুল কবির বলেন, ‘ভোট গ্রহণ করতে এসে কোনো ভয়ভীতি বা চাপের মুখোমুখি হতে হয়নি। এ ছাড়া ভোটাররাও ব্যাপক হারে ভোটকেন্দ্রে এসে ভোট দিয়েছেন।’

বেড়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মাহমুদা আক্তার বলেন, ‘বিকেল চারটায় ভোট গ্রহণ শেষ হয়ে এখন গণনা চলছে। কোনো ভোটকেন্দ্র থেকে অনিয়মের অভিযোগ আসেনি। আমি নিজে পর্যবেক্ষণ করে এবং পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রেই শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু ভোট হওয়ার তথ্য পেয়েছি। এত চমৎকার ও সুষ্ঠু ভোট সম্পন্ন হওয়ার জন্য আমি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ম্যাজিস্ট্রেট ও সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.