ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান না,লঞ্চের ত্রুটি শোধরানোর আগে

ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান না,লঞ্চের ত্রুটি শোধরানোর আগে

ঢাকা থেকে বরগুনাগামী অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনার পর দুই দিন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে নৌপরিবহন অধিদপ্তর। নানা অনিয়ম-ত্রুটি পাওয়ায় ১১টি লঞ্চকে জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। কিন্তু নৌশ্রমিকদের বিক্ষোভের মুখে দ্বিতীয় দিনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান স্থগিত করতে বাধ্য হয় অধিদপ্তর।
এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও নৌপরিবহন অধিদপ্তরের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক ডাকে লঞ্চমালিকদের সংগঠন অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থা। সদরঘাটে বিআইডব্লিউটিএর বন্দর কর্মকর্তার দপ্তরের সভাকক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে মালিক-শ্রমিক-নিয়ন্ত্রক সংস্থার ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়। রুদ্ধদার এ বৈঠকে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ছিল।
বেলা তিনটায় শুরু হয়ে দীর্ঘ দুই ঘণ্টা এ বৈঠক চলে। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র প্রথম আলোকে বলেন, সম্মিলিতভাবে মালিক ও শ্রমিকেরা যাত্রীবাহী লঞ্চের বিদ্যমান ত্রুটি নিরসনের আগে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিপক্ষে মতামত দিয়েছেন। এ জন্য তাঁরা একটি নির্দিষ্ট সময় চেয়েছেন। একই সঙ্গে কোনো লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটলেই ‘আইওয়াশ’ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা না করার অনুরোধ জানিয়েছেন মালিকেরা।

বৈঠকে আলোচিত ত্রুটিগুলো লঞ্চমালিকদের লিখিতভাবে জানানো হবে। লঞ্চের ত্রুটি শোধরাতে লঞ্চমালিকেরা সময় পাবেন। তবে এ জন্য ঠিক কত দিন পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে না, তা এখন পর্যন্ত মালিকদের জানানো হয়নি।
সদরঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়া সব লঞ্চ তদারক করতে ৫ জানুয়ারি পাঁচটি কমিটি করেছিল বিআইডব্লিউটিএ। এসব কমিটি প্রয়োজন বোধ করলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা ও লঞ্চের যাত্রা বাতিল করতে পারবে বলে বিআইডব্লিউটিএর দপ্তর আদেশে বলা হয়েছিল।
২ জানুয়ারি পৃথক এক বৈঠকে এক মাসের মধ্যে লঞ্চের সব ত্রুটি সারাবেন বলে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের জাহাজ জরিপকারক মাহবুবুর রশিদকে জানিয়েছিলেন মালিকেরা।
গতকালের বৈঠকের শুরুতেই অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল সংস্থার প্রেসিডেন্ট মাহবুব উদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে দোষারোপ করেন। তিনি বলেন, আগে বছরে চার-পাঁচটি দুর্ঘটনা ঘটত। এখন এ সংখ্যা কমে এসেছে। তবে একটি দুর্ঘটনা হওয়া মানেই ৫০ জন ‘নাই’ হয়ে যাওয়া। ফলে সারা দুনিয়ায় হইচই পড়ে যায়। তাঁদের মাথার ওপর ৪০ থেকে ৫০টি টেলিভিশন এসে দাঁড়িয়ে থাকে। আর বাংলাদেশে এখন কমপক্ষে দুই হাজার পত্রিকা রয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কথা শুনে, মিত্রপক্ষের কথা শুনে, বুঝে না বুঝে নানা রকম গল্প তৈরি করে। নানা রকম গুজব শুনে যাঁর যা খুশি লেখা শুরু করেন। ফলে মালিকদের অনেকের ঘুম হারাম হয়ে যায়।

উপস্থিত মালিকদের একজন বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করে বলেন, ‘আমরা অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল অধ্যাদেশের অধীন, ফৌজদারি কার্যবিধির অধীন নই। দুর্ঘটনা ঘটলেই আমাদের গ্রেপ্তার করবেন না। তদন্ত কমিটি কথা বলবে। যদি তদন্তে দোষী প্রমাণিত হয়, তখন গ্রেপ্তার করতে পারেন।’
গন্তব্যে আগে পৌঁছানোর প্রতিযোগিতার কারণেই বেশি ক্ষমতার ইঞ্জিন লঞ্চে লাগাতে হয় বলে উল্লেখ করেন এই মালিক। দেরিতে গন্তব্যে পৌঁছালে বিআইডব্লিউটিএর সংশ্লিষ্ট বন্দর ও স্থানীয় প্রশাসনসহ সবাই লঞ্চের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জবাবে বিআইডব্লিউটিএর নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কমবেশি সব লঞ্চেই লাইফ বয়া আছে। কিন্তু এগুলো হাতের নাগালে থাকে না। তিনি লঞ্চের কেবিনে লাইফ জ্যাকেট রাখতে মালিকদের অনুরোধ করেন। মালিক-শ্রমিক উভয়কেই প্রতিযোগিতা করে লঞ্চ

পৃথিবীর কোথাও কাজ হয় না। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার আগে মালিকদের ত্রুটি শোধরানোর সময় দিতে বিআইডব্লিউটিএ ও অধিদপ্তরকে পরামর্শ দেন তিনি।

আমাদের কি গোনায় নেওয়া যায় না! পরিবেশ-পরিস্থিতি নষ্ট হোক, তা চাইনি বলে তখন কিছু বলিনি। দোষারোপের কথা আলোচনা করব না। তবে দোষ যদি ধরতে চান, তাহলে আপনারাও (কর্তৃপক্ষ) ধরবেন, আমরাও ধরব। তাহলে দেখবেন, পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে চলে যাবে।’

অগ্রিম টিকিট কেটে লঞ্চে যাত্রী ওঠানো প্রসঙ্গে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমি আদেশের মতো করে অনুরোধ করছি, আমরা টিকিট কেটে লঞ্চে উঠব। আমরা বেশি সময় দিতে পারব না। টিকিট ছাড়া আমি লঞ্চে উঠতে দেব না। একটা লোক মরে গেল, আমি তাঁর ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছি না। আমি জানি না, আমার জাহাজে কে ছিল। ৫০০ লোক নিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আমার লঞ্চে কে ছিল, আমি তা জানি না।’
মালিকদের মধ্য থেকে কেউ কেউ বিষয়টি গণবিজ্ঞপ্তি হিসেবে প্রচার করতে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করেন। চেয়ারম্যান বলেন, ‘শুধু গণবিজ্ঞপ্তি নয়, কী কী করতে হবে বলেন। সব করা হবে।’
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন বিআইডব্লিউটিএর সদস্য (পরিকল্পনা) দেলোয়ার হোসেন। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর বৈঠকে আসার কথা থাকলেও পরে জাহাজ জরিপকারক মাহবুবুর রশিদ তাঁর প্রতিনিধিত্ব করেন।
গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ৪৭।
অভিযান-১০ লঞ্চে আগুনের সূত্রপাত ইঞ্জিন থেকে বলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এটি মানতে নারাজ অনেক লঞ্চমালিক। বৈঠকে উপস্থিত মালিকেরা দাবি করেন, এ আগুন ষড়যন্ত্র করে

বন্ধ করা। লঞ্চের মধ্যে অশুভ প্রতিযোগিতা বন্ধ করা। সংশ্লিষ্ট রুটের মালিক ও সংস্থার মতামত গ্রহণ ছাড়া যে সময়সূচি দেওয়া হয়েছে, তা বাতিল করা। ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলাচলরত লঞ্চে একজন মাস্টার ও একজন ড্রাইভার দ্বারা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া।
অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে লঞ্চমালিকদের আলোচনার অ্যাজেন্ডাপত্রে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনা কখনো বলেকয়ে আসে না। কারও অসতর্কতা ও অসচেতনতার কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। অভিযান-১০ লঞ্চটি ঢাকা থেকে ঝালকাঠি পর্যন্ত নিরাপদে পৌঁছায়। লঞ্চটিতে একই সময়ে সর্বত্র আগুন লাগে। এতে পুরো লঞ্চ ভস্মীভূত হয়ে যায়। এটা একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা। এতে কোনো ধরনের নাশকতা আছে কি না, বিভিন্ন মহল থেকে তা সুষ্ঠু তদন্তের দাবি উঠেছে। লঞ্চের মালিককে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। লঞ্চটি অরক্ষিত অবস্থায় নদীতে পড়ে আছে। সেটি মেরামত করা প্রয়োজন। তাই লঞ্চটি মালিক/সংস্থার জিম্মায় দিয়ে মেরামত করার সুযোগ দেওয়া অত্যাবশ্যক। এ ছাড়া লঞ্চের মালিক ও শ্রমিকদের মুক্তি দিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *